প্রাচীন মিশরের মমি ‘র ৯টি অদ্ভুত ব্যবহার,মমি শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন ছিল না, মানুষ এগুলো অন্য কি কি কাজে ব্যবহার করতো।

প্রাচীন মিশরের মমি ‘র ৯টি অদ্ভুত ব্যবহার,মমি শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন ছিল না, মানুষ এগুলো অন্য কি কি কাজে ব্যবহার করতো।

মিশরের নাম শুনলে প্রথমে আমাদের মাথায় যে চিন্তা আসে তা হল মমি। মমির কথা শুনলে কেমন যেন একটা গাঁ শিরশিরে অনুভূতি হয়। মিশরের মমি দেখেছেন কখনো? আসল মমি দেখেছেন হয়তো কোন যাদুঘরে। কাল্পনিক মমি অবশ্যই দেখেছেন কোন চলচ্চিত্রে বা গল্পে। কিন্তু আপনি কি জানেন এই মমি দিয়ে কতো কিছু করছে মানুষ। ঔষধ বানানো থেকে শুরু করে ছবির রঙ বানাতেও ব্যবহৃত হয়েছে মমি।১৭৯৮ সালে নোপলিয়ন মিশর আক্রমণ করে। বেশ কিছু পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ফলে ১৯ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে মিশরের মমির আজব সব ব্যবহার শুরু হয়। ১৮৩০ এর দিকে গুপ্তধনের খোঁজে বিত্তবান পশ্চিমা ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের ঢল ছোটে মিশরের মরুভূমিগুলোতে। এ নিয়ে তো অনেক গল্প, সিনেমাও তৈরি হয়েছে। এই গল্প আর সিনেমার কাহিনীগুলো কিছুটা বানানো হলেও সম্পূর্ণটা কিন্তু মিথ্যে নয়। তখন যদি কেউ মমি খুঁজে পেতেন, সেটা ছিল তার জন্য অত্যন্ত গর্বের এবং এ ঘটনাকে জীবনের অন্যতম বড় অর্জন বলে মনে করা হতো। ইউরোপীয়দের মমি উন্মাদনা এমন পর্যায়ে পোঁছে গিয়েছিল যে, কেউ মিশর থেকে ইউরোপে ফিরে যদি এক হাতে মমি আর অন্য হাতে কুমীর দেখাতে না পারতেন, তাহলে তাকে কেউ পাত্তাই দিতো না।
১৯ শতকে ইউরোপীয়রা কিভাবে মিশরের মমির ব্যবহার (আসলে অপব্যবহার করতো) করতো জানা যাক।(১)মমি দিয়ে রোগের ঔষধ তৈরি। (২)মমি থেকে তৈরি চিত্রকরের রঙ।(৩)কাগজ হিসেবে মমির ব্যবহার। (৪)মিশরের মমি দিয়ে সার তৈরি। (৫)তহবিল গঠনে মমির পদর্শনী।(৬)পার্টির জৌলুস বাড়ায় মিশরের মমি।(৭)ঘর সাজাতে স্মারক হিসেবে মিশরের মমি। (৮)মঞ্চে ভীতির আবহ তৈরীতে প্রপ হিসেবে মমি। (৯)খ্যাতিমানদের ধ্বংসাবশেষের নকল হিসেবে মমির ব্যবহার। (১)রোগের ঔষধ হিসেবে মমির ব্যবহার।অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু ১৯ শতকের শুরুর দিকে ইউরোপীয়রা সুস্বাস্থ্যের জন্য একধরনের ক্যানিবলিজম অনুশীলন করতো। ঐতিহাসিক রিচার্ড সুগের মতে, ১৯ শতকের শেষের দিকে, থেরাপিউটিক এজেন্ট হিসেবে মানব শরীরের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ছিল। বেশিরভাগ জনপ্রিয় চিকিৎসায় মানব দেহের রক্ত, মাংস, হাড় এমন কি মাথার খুলিও ব্যবহার করা হত।মমি, প্রায়ই “মামিয়া (বিটুমিন আর মমির সংমিশ্রণে এক বিভ্রান্তিকর শব্দ) হিসেবে বিক্রি করা হত, এটি ত্বকে ব্যবহার করা হত, অথবা গুড় করে পানীয়তে মিশিয়ে ত্বকের কালশিটে দাগসহ অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অনেকে মনে করতো মমিতে আরোগ্য করার বিশেষ ক্ষমতা আছে। অনেকের মতে মমিতে রক্ত চলাচল বাড়াতে বিশেষ গুণ রয়েছে। ব্যবসা হিসেবে মুম্মিয়া এমন লাভজনক আকার ধারণ করলে যে চাহিদা মেটাতে দন্ডপ্রাপ্ত আসামী, দাস, ভিক্ষু এমন কি ঊটের লাশ থেকেও নকল মমি তৈরী করা শুরু হয়েছিল, এখনকার বাজারে ঔষধ নকল করার মত।যা আবিষ্কার না হলে হয়ত প্রাচীন মিশরের ইতিহাস অজানাই থেকে যেত, কি সেই বস্তু জানতে পড়ুন, রোসেটা স্টোন: প্রাচীন মিশর আর ফেরাউন রহস্যের চাবি।(২)মমি থেকে তৈরি চিত্রকরের রঙ। ১৭ শতকের শুরুর দিকে, মমি ব্রাউন নামে এক ধরনের রঞ্জক পাওয়া যেত। মমি থেকে তৈরি এই রঞ্জক তখনকার ইউরোপীয় শিল্পীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। চিত্রশিল্পী
দ্যলাক্রোয়া এটি ব্যবহার করতেন, বৃটিশ শিল্পী স্যার উইলিয়াম বিচে ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে প্রাক-রাফায়েলীয়দের কাছে এর বেশি পছন্দের ছিল। মমি ব্রাউন তৈরী হত মমির মাংস থেকে। তবে বেশির ভাগ লোকে অজান্তেই ব্যবহার করতো। কি দিয়ে তারা আঁকছে তা তারা জানতোই না।(৩)কাগজ হিসেবে মমির ব্যবহার।যারা কাগজ তৈরীর ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা করেন তাদের কাছে এটা একটি বিতর্কিত বিষয়। অনেক গবেষকের মতে, ১৯ শতকের মধ্যভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে কাগজের মিলগুলো মমি মোড়ানো কাপড়গুলো কাঁচামাল হিসেবে আমদানী করতো। অনেকের মতে ১৯ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকায় মুদ্রিত জিনিসের বেশ ভাল চাহিদা দেখা যায়। গাছের পাল্পে কাগজ তৈরী শুরু হয় ১৮৫০ সালে যখন মমি কাগজের সল্পতা দেখা যায়। যদিও অনেকের মতে মমির সংখ্যা ছিল প্রচুর। তাই এ গল্পটি নিয়ে মত পার্থক্য রয়েছে।(৪)মিশরের মমি দিয়ে সার তৈরি।দেব-দেবীদের প্রসন্ন লাভে লক্ষ লক্ষ জীবজন্তু প্রাচীন মিশরে মমি করা হয়েছিল। এতো জীবজন্তুর মমির ভিড়ে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গিয়েছে বিড়ালের মমি। বিড়ালের মমির পরিমান এতো ছিল যে ১৯ শতকের শেষের দিকে ইংরেজ কোম্পানিগুলো কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য মিশর থেকে এগুলো কিনে নেয়। এক হিসেবে পাওয়া গেছে একটি কোম্পানী প্রায় ১৮,০০০ বিড়ালের মমি কিনেছিল। যার ওজন প্রায় ১৯ টন হবে। এগুলো দিয়ে সার তৈরী করা হয়েছিল এবং সাড়া ইংল্যান্ডে জমিতে তা ব্যবহার করা হয়েছিল। এই চালানের একটি বিড়াল খুলি এখনও ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ন্যাচারাল হিস্টরি ডিপার্টমেন্টে রক্ষিত আছে।(৫)তহবিল গঠনে মমির পদর্শনী।ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটাল প্রথম স্থান যেখানে আধুনিক অ্যানেস্থেশিয়া ব্যবহারে প্রথম পাবলিক সার্জারি করা হয়েছিল, ১৮৪৬ সালে এই স্থানটি ইথার ডোম নামে একটি এম্পিথিয়েটার ছিল। কিন্তু এছাড়াও এ স্থানে আরেকজনের বসবাস ছিল যা কোন হসপিটালে থাকে না,তা হল একটি মিশরের মমি।
১৮২৩ সালে মমিটি ম্যাসাচুসেটস জেনারেল উপহার হিসেবে আসে সিটি অব বোস্টন পক্ষ থেকে। ১৯ শতকের শুরু দিকে মমিটি মূলত কিনে আনেন একজন ডাচ ব্যবসায়ী, তিনি ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে এটা দেন হসপিটালের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে। হসপিটালের মতে, মমিটি দেখতে শত শত লোক জড় হয়েছিল, প্রত্যেকে তখন ০.২৫ ডলারের বিনিময়ে দেখেছিল আমেরিকায় প্রথম মানুষের সম্পূর্ণ মিশরীয় মমি। এরপরে বহুবার বহু স্থানে প্রদর্শনী করে হসপিটালের জন্য তহবিল সংগ্রহে ব্যবহার করা হয়েছে । মমিটি আজও সেই হসপিটালে অবস্থান করছে।(৬)পার্টির জৌলুস বাড়ায় মিশরের মমি।কোন পার্টি বা গেট-টুগেদারের জন্য একটা থীম দরকার? ভিক্টোরিয়ান আমলের কোন রহস্য উন্মোচন হতে পারে বা পার্টিতে কোন মমি খোলা হতে পারে। ব্যপারটা এমন যে আপনার ড্রইং রুমে তুতেনখামুনের মমি রহস্য উন্মোচন করা হচ্ছে, পার্টিতে সবার মধ্যে এক শিহরণ খেলে যাচ্ছে। পার্টির জৌলুস বাড়াতে এমন ধরনের থীমের ব্যবহার তখনকার দিনের ইংরেজ জীবনে নতুন কোন ব্যপার ছিল না, বিশেষ করে যারা নিজেদেরকে একটু পণ্ডিত মনে করতেন।(৭)ঘর সাজাতে স্মারক হিসেবে মিশরের মমি।১৯ শতকের বিত্তবান শ্রেণীর মধ্যে মিশর যাত্রা এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে অনেকে বাড়ীতেই ড্রইং রুমে স্মারক হিসেবে মমি রাখা হতো। অনেক সময় বেডরুমেও মমি রাখতো। অনেকে বাড়ির বিভিন্ন স্থানে মমির হাত, পা বা মাথার প্রদর্শনী করতো। বিশেষ করে বাড়ীর মেনটালপিছের উপরে কাঁচের ডোমের উপর সেগুলো দেখা যেত। অনেক সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও মমি প্রদর্শীত হতো। সিকগোর একটি ক্যান্ডি শপে ১৮৮৬ সালে একটি মিশরীয় মমি প্রদর্শন করে ক্রেতা আকৃষ্ট করা হতো। বলা হতো মমিটি ফেরাউনের মেয়ে মমি যিনি মূসাকে নলখাগরার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিল। এগুলো ছিল আসলে লোক দেখানো বিষয়। মানুষকে ধাঁধাঁয় ফেলে দেয়াই ছিল এই উচ্চবিত্তদের কাজ।(৮)মঞ্চে ভীতির আবহ তৈরীতে প্রপ হিসেবে মমি। সাহিত্য এবং হরোর সিনেমাতে মমিগুলো রোমান্টিক ভূত হিসেবে বেশ পরিচিত। কিন্তু যাদুর মঞ্চে এখন আর মমি দেখা যায় না। এখনকার মতই ভয়ঙ্কর আর উদ্ভট একটা অনুভূতি দিতে তখন যাদুর মঞ্চে প্রপ হিসেবে মমি ব্যবহার করা হত। তা সে আসল বা নকল মমিই হোক না কেন।(৯)খ্যাতিমানদের ধ্বংসাবশেষের নকল হিসেবে মমির ব্যবহার।১৪৪৩ সালে জোয়ান অফ আর্ককে পুরিয়ে মারার পরে তার হত্যাকারীরা মনস্থির করে তার কোন চিহ্ন পৃথিবীতে রাখবে না। তাকে দ্বিতীয়বার পোড়ানো হয়েছিল এবং ধ্বংসাবশেষ নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু ১৮৬৭ সালে একটি পাত্র আবিষ্কৃত হয়, যাতে জোয়ান অব আর্কের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হত। চার্চ পাত্রটিকে আসল বলে ঘোষণা দিয়েছিল, পরবর্তীতে তা একটি জাদুঘরে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ২০০৭ এ ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা এটা পরীক্ষা করে দেখেন এর মধ্যে যা রয়েছে তা জোয়ানের প্রায় হাজার বছর আগেকার কোন বস্তু। এগুলোর মধ্যে আছে মানব পাঁজর ও বেড়ালের অস্থিমজ্জা, যা প্রাচীন মিশরীয় মমির অংশ।

1 টি মন্তব্য:

Goldmund থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.